মনির আহমেদ:
গরীব, মধ্যবিত্ত আর নিম্ন আয়ের মানুষরা খুব বেশীদিন কর্মহীন অবস্থায় ঘরবন্দি থাকতে পারবে না। কারণ, একটি নির্দিষ্ট মাফকাঠির মধ্যেই তাদেরকে জীবনযাপন করতে হয়। গত প্রায় দুই মাস যাবত ভয়াবহ দুঃশ্চিন্তা নিয়ে দুর্বিসহ জীবনযাপন করতে গিয়ে তারা এখন অনেকটাই হাঁপিয়ে উঠেছে। এখন আর চাইলেই তাদেরকে ঘরবন্দি রাখা যাবেনা। তারা ঘরের বাহিরে আসবেই। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত আর নিম্ন মধ্যবিত্তের অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে। তারা লজ্জায় কোথাও হাত পাততে পারেনি। অপরদিকে চলমান দুর্যোগকালীন সময়ে দেশের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য সরকার কর্তৃক বরাদ্ধকৃত খাদ্য সহায়তারও সুষম বন্টন হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই বৈষম্য হয়েছে। তার উপর চুরিচামারিতো আছেই। বলা যায় অসাধু জনপ্রতিনিধিরা চাল চুরিতে রীতিমত মহোৎসব করেছে। এক কথায় বলতে গেলে চলমান করোনা দুর্যোগ মোকাবেলায় শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় সরকারের বহুমুখী পদক্ষেপ থাকলেও বেশকিছু অসাধু জনপ্রতিনিধিদের অনৈতিক দৌরাত্বে তা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। কঠিন এবং দুর্বিসহ বিপর্যয়ে পতিত দেশের কর্মহীন জনগোষ্ঠির জন্য রাষ্ট্রকতৃক বরাদ্ধকৃত খাদ্যসামগ্রী এবং সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু জনপ্রতিনিধি চাঁদাবাজি করে যাদেরকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছে, বলা যায় তারা প্রায় সকলেই নিজেদের ঘরানার লোক। সক্রিয় ভিন্নমতাবলম্বী অসহায়দের সরকার বা স্থানীয় কোন প্রতিনিধি খাদ্য সহায়তা করেনি বললেই চলে। সর্বোপরি তারা যতটুকু করেছে আর যাদের জন্য করেছে তা কোনভাবেই পর্যাপ্ত নয়। খেটে খাওয়া দিনমজুর থেকে শুরু করে রিক্সা, ভ্যান, সিএনজি চালক, ক্ষুধে ব্যবসায়ী, হোটেল রেস্তোরার শ্রমিক, হকার, পরিবহন শ্রমিক, স্বল্প বেতনের বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারিদের জীবন এখন দুর্বিসহ অবস্থায়। দেশের পরিবহন শ্রমিকদের কল্যাণের নামে সারাবছর কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি হলেও বর্তমান ভয়াবহ দুর্যোগের সময়ে তাদের তেমনটা খবর নিচ্ছে না। করোনা মোকাবেলায় মার্চের শুরুতে সবকিছু বন্ধ ঘোষণা করা হলেও জানুয়ারি থেকেই ঈদ ব্যবসার প্রস্তুতি শুরু করেছে আমাদের দেশের রেডিমেড পোষাক বিক্রেতারা। সারাদেশের পোষাক ব্যবসায়ীরা সারাবছর বসে থাকে শুধুমাত্র ঈদ কেন্দ্রীক ব্যবসার আশায়। এলক্ষ্যে তারা বিনিয়োগ শুরু করে ঈদ আসার ৪/৫ মাস আগ থেকেই।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় সারাদেশের তৈরী পোষাকের দোকানে গড়ে দুইজন করে কর্মচারী ধরলেও প্রায় পাঁচলক্ষ দোকানে দশলক্ষ কর্মচারী হয়, যাদেরকে দোকান মালিকরা বছরের বৃহৎ সময় অনেক কষ্ট করে বেতন দিয়ে ধরে রাখতে হয় শুধুমাত্র ঈদ ব্যবসার আশায়। দিনমজুর, রিকসা, সিএনজি, ভ্যান চালক, পরিবহন এবং হোটেল রেস্তোরার শ্রমিকরাতো একদিনের রোজগার দিয়ে ঠিকভাবে একদিনও চলতে পারেনা। বেসরকারি বিভিন্ন অফিসের স্বল্প বেতনের কর্মচারীরাদেরও এই পরিস্থিতিতে অফিস মালিকরা হয়তো বেতন দিবেনা। কঠিন এই বিপর্যয় মুহুর্তে জনজীবন এখন দুর্বিসহ অবস্থায় বিরাজমান। মৃত্যু ঝুঁকি থাকলেও কেউ এখন আর ঘরে থাকবেনা। বলা যায় সকলের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ শর্তে দোকানপাট খুলে লকডাউন শিথিল করার ঘোষনার আগেই জেলা/উপজেলায় দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে দোকান মালিকরা। প্রশাসনও আগের মত কঠোরতা দেখাচ্চেনা। সরকারি প্রজ্ঞাপনে ১০ মে থেকে দোকানপাট খোলার সিদ্ধান্ত থাকলেও সোমবার থেকেই সারাদেশে দোকানপাট খুলতে দেখা গেছে।
দেশের নির্ভরযোগ্য গনমাধ্যমে সুত্রে খোদ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপুর্ণ সড়কেই ভয়াবহ যানজট এবং মানুষের ভীড় দেখা যায়। বৃহস্পতিবার থেকে বিশেষ শর্তে মসজিদে নামাজ পড়ার অনুমুতিও দিয়েছে সরকার। যদিও গত শুক্রবার থেকেই দেশের অধিকাংশ মসজিদে মুসল্লীদের ভীড় দেখা গেছে। এক কথায় বলতে গেলে করোনায় মৃত্যু ঝুঁকি দেখিয়েও মানুষকে আর ঘরবন্দি রাখা যাচ্ছেনা। মানুষ মনে করে, ঘরে থাকলে না খেয়ে মরবো, আর বাহিরে গেলে করোনায় মরবো। মৃত্যুই যখন নিশ্চিত তখন মৃত্যু ঝুঁকি নিয়েই বাঁচার চেষ্টা করবে মানুষ।