জানা যায়, লাকসাম পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের সাতবাড়িয়া গ্রামের শরিফুল আলম শাকিলের স্ত্রী মৌসুমী আলম ৩৩ সপ্তাহের অন্তসত্ত্বা ছিলেন। তার মধ্যে করোনার উপসর্গের খবর জানতে পেরে স্থাণীয় প্রশাসন তাদের বাড়ি লকডাউন করে দেয়। এরই মধ্যে অবস্থার অবনতি হলে ১১ জুন তাকে রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে গাইনী ওয়ার্ডে ভর্তি করে নমুনা সংগ্রহ করা হয়, পরবর্তীতে যার রিপোর্ট পজিটিভ আসে। ওই নারীর শারীরীক অবস্থা বিবেচনায় ওইদিনই আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু আইসিইউতে চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে রাখার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের আশানুরুপ কোন সহযোগিতা না পেয়ে রবিবার (১৪ জুন) বিকেল ৫টার দিকে ওই নারীর দেবর ডা. আর.এ সৈকত লাকসাম থেকে নিয়ে যাওয়া তার হাসপাতালের আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনে ভাবির আল্ট্রা করে পরিবারের অন্য সদস্যদের সহযোগিতায় নরমাল ডেলিভারি ব্যবস্থা করলে ওই নারী মৃত পুত্র সন্তান প্রসব করেন। এসময় হাসপাতালের কোন চিকিৎসকই এগিয়ে আসনেনি। এর প্রায় দেড় ঘন্টা পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ওই নারীও মারা যান। মারা যাওয়ার পূর্ব মুহুর্ত থেকেই সফিউল আলম শাওন নামক ওই নারীর ছোট দেবর লাইভ ভিডিও করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেন, যাতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ করা হয়। ওই ভিডিওটি মুহুর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
এদিকে, মৌসুমী আলমের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তার স্বজনরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এসময় স্বজনরা করোনায় মারা যাওয়া মৌসুমীকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্নাকাটি করতে থাকেন। তাদের কান্নায় হাসপাতালের আইসিইউ ওয়ার্ডে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
ঢাকা থেকে ওই নারীর মরদেহ লাকসামে এনে রবিবার (১৫ জুন) রাত ৩টার দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এসময় উপস্থিত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আবদুল আলী, মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আবদুল মতিন ও থানার অফিসার সেকেন্ড অফিসার জাহাঙ্গীর আলম উপস্থিত ছিলেন।
মৌসুমী আলমের দেবর শফিউল আলম শাওন জানান, আমার বড় ভাইয়ার বিয়ের পর থেকে কখনো তাঁকে ভাবি বলে ডাকিনি। তাঁর আন্তরিকতার কারণে আপা বলেই সর্বদা সম্বোধন করেছি। তাঁর প্রতি পরিবারের কোন সদস্যের আন্তরিকতার বিন্দুমাত্র অভাব ছিল না। ব্যক্তিত্ব গুণে তিনি সকলের মন জয় করে নিয়েছেন। আজ তাঁকে হারিয়ে আমাদের পরিবারের সবাই বাকরুদ্ধ। তাঁর আড়াই বছরের একমাত্র কন্যা সন্তানকে কি শান্তনা দিব বুঝছি না।
তিনি কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, আমার আপার (ভাবি) অবস্থার অবনতি হলে মুগদা জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে নেয়া হলেও সেখানে ডাক্তারদের চরম অবহেলার কারণেই তিনি মারা যান। ডাক্তাররা আন্তরিক হলে ভাবিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে পেতাম। ওই ওয়ার্ডের ১০টি আইসিইউ বেড থাকলেও চিকিৎসকরা কাউকে সঠিকভাবে পরিচর্যা করেন না বলে তিনি অভিযোগ করেন।
লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আবদুল আলী করোনায় আক্রান্ত হয়ে অন্তসত্ত্বা নারী মৌসুমী আলমের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।